চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থি শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানকে ৯ ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পরে চাকসু নেতাদের বাধার মুখেও বাসায় পৌঁছে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ১০ জানুয়ারি শনিবার রাত ৯টার দিকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে থেকে প্রক্টরের গাড়িতে করে ওই শিক্ষককে ক্যাম্পাস থেকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এর আগে তিনি হামলা ও হেনস্থার শিকার হন।
এদিন দুপুর ১২টার দিকে ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে চাকসু নেতারা আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমানকে আইন অনুষদ এলাকা থেকে টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যান। পরে সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাকে উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের দপ্তরে নেওয়া হয়। সেখানে উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান, প্রক্টর হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী এবং চাকসু নেতারা বৈঠক করেন।
বৈঠক শেষে রাত ৯টার দিকে চাকসুর সহ-ছাত্রী কল্যাণ সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদাউস রিতার বাধার মুখেও প্রক্টরের গাড়িতে করে ওই শিক্ষককে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিতে দেখা যায়।
এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ১ মিনিট ৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে কয়েকজন ছাত্র টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এ রমধ্যে একজনকে পেছন থেকে তাকে চেপে ধরতে দেখা যায়। সেখানে চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি ও নির্বাহী সদস্য সোহানুর রহমানকে দেখা গেছে। এ সময় শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ চিৎকার করছিলেন। ওই অবস্থায় তাকে একটি অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসান মোহাম্মদ রোমান বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো সত্য নয়। “মাদকের বিষয়ে যেসব স্ক্রিনশট দেখানো হয়েছে, সেগুলো আমার নয়।” ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আমি নিজ থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিনি। “আমি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না।”
সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমান তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আরো বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আমি একদিনও বের হইনি। সহকারী প্রক্টর হিসেবে কাউকে মামলা দেইনি। পরীক্ষার হলে থাকা অবস্থায় স্টাফরা আমাকে জানায় যে বাইরে থেকে লোকজন আসছে। আমি বের হওয়ার সময় তারা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলে ভয়ে দৌড় দেই এবং পড়ে যাই। আমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে মব সৃষ্টি করা হয়েছে।’
চাকসুর আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক ফজলে রাব্বি বলেন, “আমরা আড়াই ঘণ্টার মতো থানায় বসেছিলাম মামলা দেওয়ার জন্য। তবে তারা মামলা গ্রহণ করেননি। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়া মামলা নেওয়া সম্ভব নয়।”
চাকসুর জিএস সাঈদ বিন হাবিব বলেন, “তৎকালীন ফ্যাসিস্ট’ সরকারের সময় উনি শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়ে মামলা দিতেন। চাকসুর এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক বলেন, “চাকসু নেতারা হাসান মোহাম্মদ রোমানকে যে প্রক্রিয়ায় আটক করেছে, তা দায়িত্বশীল জায়গা থেকে সমর্থনযোগ্য নয়।
“নিয়োগ নিয়ে সমালোচোনার মুখে এ কাণ্ড ঘটেছে কিনা, প্রশ্ন থেকে যায়। চাকসু নেতারা রোমান শুভকে নিয়ে হঠাৎ সক্রিয় হলেও নিয়োগে অনিয়ম নিয়ে চুপ।”
এদিকে শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি বলে জানান হাটহাজারী থানার ওসি মো. জাহিদুর রহমান।
জবি শিক্ষক ফোরামের নিন্দা-
হাসান মোহাম্মদ রোমানকে হেনস্থার ঘটনায় ‘উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা’ জানিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম।শনিবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, “একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষককে প্রকাশ্যে অপমান, শারীরিকভাবে হেনস্তা করা কিংবা ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করা দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত।
“মতভেদ বা বিতর্ক থাকলেও তা নিরসনের একমাত্র পথ আইন, প্রশাসনিক তদন্ত ও ন্যায্য প্রক্রিয়া, কোনোভাবেই ‘মব জাস্টিস’ গ্রহণযোগ্য নয়।”