বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫৫তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে রক্তস্নাত বাংলার মাটিতে পা রাখেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর আগমনে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় পূর্ণতা পায়। স্বয়ং বঙ্গবন্ধু তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদাররা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাসা থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তাকে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি করা হয়। বাঙালি যখন স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে, বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের কারাগারে প্রহসনের বিচারে ফাঁসির আসামি হিসেবে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালিদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়ার পর বিশ্বনেতারা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। আন্তর্জাতিক চাপে পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ২৯০ দিন পাকিস্তানের কারাগারে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর প্রহর গণনা শেষে লন্ডন-দিল্লি হয়ে তিনি ঢাকায় পৌঁছেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি।
এদিন স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন বিজয়ের মালা পরে। দিনটিতে বাংলাদেশে ছিল এক উৎসবের আমেজ। গোটা বাঙালি জাতি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল—কখন তাদের প্রিয় নেতা স্বাধীন দেশের মাটিতে এসে পৌঁছবেন। লাখ লাখ মানুষ সেদিন জড়ো হয়েছিলেন ঢাকা বিমানবন্দর এলাকায়। বিমানবন্দর থেকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পর্যন্ত রাস্তা ছিল লোকারণ্য। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু। দীর্ঘ ৯ মাস পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের গণহত্যার সংবাদ শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। প্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আনন্দাশ্রুতে সিক্ত হয়ে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনিতে প্রকম্পিত করে তোলে বাংলার আকাশ-বাতাস। সেদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব বলেন, ‘যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালোবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালোবাসি, আমি জানতাম না, সে বাংলায় আমি আসতে পারবো কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি—বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি মহান মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক ইতিহাসের একটি বিশেষ মাইলফলক। ১৯৪৭ সালে ভ্রান্ত দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার মানুষকে নতুন করে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথপরিক্রমায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলে বাঙালি জাতি। বাঙালি জাতিকে মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত করে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের পথে এগিয়ে নিয়ে যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাঙালি জাতির হৃদয়ে প্রজ্বলিত করেছিল অনুপ্রেরণার দেদীপ্যমান আলোক শিখা। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করা হয়েছিল ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা হিসেবে’। সেই থেকে প্রতিবছর পালিত হয়ে আসছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস।
উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। তৎকালীন অবিভক্ত পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ৩১৩টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এরমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনেই তারা বিজয়ী হয়। আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৭৫% লাভ করে। একই বছরের ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী: পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ৮১টি আসনে জয়ী হয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ৬-দফা কর্মসূচির পক্ষে বাঙালি জনগণ একচেটিয়া রায় প্রদান করে। তবে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক জান্তা ও পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনৈতিক নেতারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি ও টালবাহানা শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় রূপ নেয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬৭টি আসন লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী, বিশেষ করে ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো, বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্ব দেখে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবং ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন। ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর বর্বরোচিত হামলা শুরু করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতেই তাঁর নামে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, যা দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।