পদ্মার শীতল বাতাসে ঘেরা মাদারীপুরের শিবচর। হাইওয়ে থেকে একটু ভেতরে ঢুকলেই দত্তপাড়া ইউনিয়নের সুনসান, সবুজে মোড়া সূর্যনগর গ্রাম। নীরবতার মাঝেই যেন লুকিয়ে আছে গ্রামের সহজ-সরল সৌন্দর্য। আর এই প্রাকৃতিক পরিবেশেই গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী কমলার বাগান, যা আজ শিবচরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
বিদেশ থেকে দেশে ফিরে নতুন স্বপ্ন বুকে নিয়ে রাসেল হোসেন নয় বিঘা জমির মধ্যে দেড় বিঘা জায়গায় প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর স্বপ্নের কমলার বাগান। ছয় বছর আগে রোপণ করা চারা আজ পরপর দুই মৌসুমে দিচ্ছে চোখ ধাঁধানো ফলন। টক-মিষ্টি স্বাদের ছোট আকৃতির কমলাগুলো গাছে গাছে ঝুলে থাকে থোকায় থোকায়—বাগানে ঢুকলেই মনভরে ওঠে সুগন্ধে, চোখে পড়ে হলুদ-সবুজের মনোমুগ্ধকর সমারোহ।কমলার পাশাপাশি মাল্টা, পেয়ারা ও ড্রাগন ফলের চাষে বাগানটি এখন এক সমন্বিত ফলখামারে পরিণত হয়েছে। দত্তপাড়া মৃধাকান্দির লিজকৃত জমিতে ৬০টি কমলাগাছের অধিকাংশই এখন নিয়মিত ফল দিচ্ছে। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি ২৮০–৩০০ টাকা দামে বিক্রি হয় রাসেলের বাগানের কমলা। ফরমালিনমুক্ত ও তাজা হওয়ায় শহর-গ্রাম থেকে অনেকেই সরাসরি বাগানেই আসেন কেনার জন্য। ক্রেতা ফেরদৌস ওয়াহিদ, এবং মোঃ শফিকুল ইসলাম, সাহাদাত হোসেন বলেন, “গাছ থেকে পাড়া কমলার স্বাদ জীবনে এই প্রথম পেলাম। একেবারেই প্রাকৃতিক স্বাদ—কোনো রাসায়নিক নেই। তাই দু’কেজি নিয়ে গেলাম। রাসেল জানান, এই বাগান তাঁর বাবার স্বপ্ন হলেও পরবর্তীতে সেটাই হয়ে ওঠে তাঁর নিজের সাধনা। সৌদি আরবে চাকরি করলেও মন পড়ে থাকত গ্রামের মাটিতে। শেষমেশ চাকরি ছেড়ে পুরো সময়টা তিনি এখন কৃষিকাজেই দিচ্ছেন। তিনি বলেন, “গত মৌসুমে ফলন ছিল দারুণ। এবার ফল কিছুটা কম, তবে স্বাদ আরও উন্নত। কমলার সঙ্গে মাল্টা, পেয়ারা, ড্রাগন—সব মিলিয়ে এখন বেশ বড় একটি বাগান দাঁড়িয়ে গেছে। অনলাইনে অর্ডারপাই, তবে শিবচরেই বিক্রি শেষ হয়ে যায়।
নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে রাসেলের পরামর্শ—মাটিকে ভালোবাসতে হবে। পরিশ্রম ছাড়া সফলতা আসে না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, রাসেলের বাগান এখন পূর্ণ ফলনের পর্যায়ে রয়েছে এবং উৎপাদিত কমলার মান অত্যন্ত ভালো। মিশ্র ফল বাগান প্রকল্পের আওতায় তাকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে সার ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত পরামর্শে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা পাশে থাকবেন।
তিনি আরও বলেন,কৃষি ঋণ নিতে চাইলে ফসলি জমির বিপরীতে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পেতে আমরা তাকে সহায়তা করব। বাগান সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় মানসম্মত চারা মোস্তফাপুর হর্টিকালচার সেন্টার থেকে সংগ্রহেও সহযোগিতা করা হবে।
দেশের যে অঞ্চলে কমলা চাষ এখনো খুব একটা প্রচলিত নয়, সেখানে প্রবাসফেরত এক তরুণের পরিশ্রম ও অধ্যবসায় শিবচরের মাটিতে সৃষ্টি করেছে নবদিগন্ত। রাসেল হোসেনের বাগান যেমন কৃষিতে বৈচিত্র্য এনেছে, তেমনি অঞ্চলের তরুণদের মধ্যেও জাগিয়ে তুলেছে নতুন উদ্যোগ ও স্বনির্ভরতার অনুপ্রেরণা।