ইরানে চলমান বিক্ষোভ ও সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কড়া হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নামায় প্রতিদিনই বাড়ছে ধড়পাকড় ও প্রাণহানির সংখ্যা। এই টালমাটাল অবস্থার মধ্যেই জাতির উদ্দেশে টেলিভিশনে ভাষণ দিলেন দেশটির সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লা আলী খামেনেই। গোটা অস্থিরতার জন্য সরাসরি আমেরিকা ও ইজরায়েলকে দায়ী করে তিনি অভিযোগ করেন, বিদেশি সন্ত্রাসবাদী এজেন্টদের মদদেই ইরানে বিদ্রোহ উসকে দেওয়া হচ্ছে।
ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে খামেনেই বলেন, “ট্রাম্পের হাত ইরানি জনগণের রক্তে রাঙা। তিনি হাজারো ইরানির মৃত্যুর জন্য দায়ী।” একই সঙ্গে তিনি বিক্ষোভকারীদের দেশবিরোধী আখ্যা দিয়ে হুঁশিয়ারি দেন—সরকারবিরোধী আন্দোলনে জড়িতদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত দেড় সপ্তাহ ধরে ইরানের বিভিন্ন শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমেছে। তাঁদের মূল স্লোগান—“স্বৈরাচারের পতন হোক”, “মোল্লাতন্ত্রের অবসান চাই”। অনেক বিক্ষোভকারীর দাবি, ইরানের শাসনব্যবস্থা আবার শাহ বংশের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমনের পথে হাঁটছে খামেনেই প্রশাসন। আমেরিকার ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি’র তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে পুলিশের অভিযানে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনকে।
টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে খামেনেই আরও বলেন, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দেশে অরাজকতা ছড়াচ্ছে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। বিদেশি এজেন্ট হিসেবে কাজ করা ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলে বিক্ষোভকারীদের আমেরিকা ও ইজরায়েলের মদদপুষ্ট বলে উল্লেখ করে খামেনেই বলেন,
“লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ষড়যন্ত্র করে আমাদের থামানো যাবে না।”
অতীতে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের কারণেই হাজার ইরানির রক্ত ঝরেছে।” একই সঙ্গে আমেরিকাকে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার কড়া বার্তাও দেন তিনি।
এদিকে ইরানের শেষ রাজবংশের উত্তরসূরি রেজা পাহলভির দিকেও অভিযোগের আঙুল তুলেছে তেহরান। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত পাহলভি বিদেশ থেকে আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছেন বলে দাবি করেছে খামেনেই প্রশাসন।
অন্যদিকে, খামেনেইয়ের বক্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানে যদি একজন প্রতিবাদীরও মৃত্যু হয়, তবে আমেরিকা তার জবাব দেবে। এই পাল্টাপাল্টি হুমকির জেরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, আন্তর্জাতিক চাপ ও অর্থনৈতিক সংকট—সব মিলিয়ে ইরান এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। প্রশ্ন উঠছে, রক্তাক্ত এই পরিস্থিতি কি শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের দিকে গড়াবে, নাকি আরও কঠোর দমননীতির মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখবে খামেনেই প্রশাসন—সে দিকেই তাকিয়ে গোটা বিশ্ব।